শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
বিজ্ঞাপন নমুনা বিজ্ঞাপন (বদলে দিন)
সংবাদ শিরোনাম

মানুষ ও প্রতিষ্ঠানের টানাপোড়েনে সমাজ

ড. মো. শাহরিয়ার ইসলাম
প্রকাশ: ৬ নভেম্বর ২০২৬, ৯:৫২ অপরাহ্ন
মানুষ ও প্রতিষ্ঠানের টানাপোড়েনে সমাজ

একদিন ট্রেন স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ ট্রেনের ভেতর থেকে একজন নারী পানির বোতল প্ল্যাটফর্মে ছুড়ে ফেললেন। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, বোতলটি কি তার? তিনি বললেন, না। তখন জানতে চাইলাম, তাহলে বোতলটি প্ল্যাটফর্মে ফেললেন কেন? তার উত্তর ছিল, ট্রেনের ভেতরে ময়লা ফেলার কোনো জায়গা নেই, আর সরকার তো প্ল্যাটফর্ম পরিষ্কার করবেই।


ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। কিন্তু একটু গভীরভাবে ভাবলে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে। ট্রেনের ভেতরে ময়লা ফেলার ব্যবস্থা থাকলে কি তিনি বোতলটি বাইরে ফেলতেন? প্ল্যাটফর্মে ময়লা ফেললে জরিমানার বিধান থাকলে কি তার আচরণ বদলাতো? সম্ভবত বদলাতো। কিন্তু শাস্তির ভয়ে ময়লা না ফেলা আর জনপরিসর পরিষ্কার রাখাকে নিজের দায়িত্ব মনে করা কি একই বিষয়?

প্রথম ক্ষেত্রে মানুষ একটি নিয়ম মেনে চলে, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে সেই নিয়মের পেছনের মূল্যবোধকে নিজের বিশ্বাস ও আচরণের অংশ করে নেয়। এই পার্থক্যটি শুধু পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে নয়, বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা এমন এক সময়ে বসবাস করছি, যখন পৃথিবীর বিভিন্ন সমাজে ব্যক্তিস্বাধীনতা, অধিকার, আত্মপরিচয়ের স্বীকৃতি এবং নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দাবি হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তি মানুষের যোগাযোগ ও মতপ্রকাশের সুযোগ বাড়িয়েছে।

দীর্ঘদিনের অনেক বৈষম্যমূলক আইন ও সামাজিক প্রথা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। কিন্তু একই সময়ে বিভিন্ন সমাজে রাজনৈতিক মেরুকরণ, ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা, সামাজিক বিদ্বেষ এবং সহিংসতাও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসে, নিজের স্বাধীনতা ও অধিকার সম্পর্কে আমরা যতটা সচেতন হচ্ছি, অন্যের স্বাধীনতা ও মর্যাদার প্রতি কি ততটাই শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠছি?

এই প্রশ্নের অর্থ ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সামাজিক অসহিষ্ণুতার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা নয়। বরং সমাজের এক ক্ষেত্রে অগ্রগতি ঘটলে অন্য ক্ষেত্রেও কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অগ্রগতি ঘটে, সেটিই বিবেচ্য। একটি সমাজ আইনগত, অর্থনৈতিক কিংবা প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে যেতে পারে, কিন্তু সেই অগ্রগতির সঙ্গে মানুষের পারস্পরিক আস্থা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ একই গতিতে বিকশিত হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

কারণ সামাজিক পরিবর্তন এবং মানবিক অগ্রগতি এক বিষয় নয়। পরিবর্তন যেমন স্বাধীনতা, সমতা ও ন্যায়বিচারের সুযোগ সম্প্রসারিত করতে পারে, তেমনি নতুন ধরনের বৈষম্য, বিভাজন ও সংঘাতও তৈরি করতে পারে।

 

সমাজ অবশ্য কখনো স্থির থাকে না। মানুষের প্রয়োজন, অর্থনৈতিক সম্পর্ক, প্রযুক্তি, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং মূল্যবোধের পরিবর্তনের সঙ্গে সমাজও বদলায়। কখনো পরিবর্তন আসে রাষ্ট্রীয় নীতি ও আইন সংস্কারের মাধ্যমে, কখনো সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগে, আবার কখনো অর্থনৈতিক সংকট, যুদ্ধ কিংবা নতুন প্রযুক্তি প্রচলিত সামাজিক ব্যবস্থাকে বদলে দেয়।

তবে এসব পরিবর্তনের প্রভাব শুধু নতুন আইন বা সুযোগ সৃষ্টির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; মানুষের দৈনন্দিন আচরণ, পারিবারিক সম্পর্ক এবং সামাজিক প্রত্যাশাও পরিবর্তিত হতে পারে।

নারীর শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের প্রসারের উদাহরণ বিবেচনা করা যাক। অনেক সমাজে মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে রাষ্ট্রীয় নীতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং আইনি সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করলেই মেয়েদের শিক্ষা নিশ্চিত হয় না। পরিবারকে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে হয়, সামাজিক বাধা মোকাবিলা করতে হয় এবং কর্মক্ষেত্রেও নারীর অংশগ্রহণের পরিবেশ তৈরি করতে হয়।

আবার শিক্ষিত নারীরা কর্মজীবনে প্রবেশ করলে পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সামাজিক প্রত্যাশাতেও পরিবর্তন আসতে পারে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করে, মানুষ সেই সুযোগ ব্যবহার করে এবং মানুষের পরিবর্তিত আচরণ নতুন সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা তৈরি করে। কিন্তু কোনো পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া আর সেই পরিবর্তনের অন্তর্নিহিত মূল্যবোধকে নিজের বিশ্বাসের অংশ করে নেওয়া এক বিষয় নয়।

ধরা যাক, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্ম, লিঙ্গ কিংবা সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা নিয়ম অনুযায়ী বৈষম্যমূলক আচরণ থেকে বিরত থাকতে পারেন। কিন্তু তাদের ব্যক্তিগত মনোভাব অপরিবর্তিত থাকলে আনুষ্ঠানিক বৈষম্য কমলেও সামাজিক দূরত্ব কিংবা অবজ্ঞা থেকে যেতে পারে।

অন্যদিকে, মানুষ যখন অন্যের সমান মর্যাদাকে নিজের নৈতিক বিশ্বাসের অংশ হিসেবে গ্রহণ করে, তখন নিয়মের বাইরেও তার আচরণে সেই মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটে। এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, মানুষের মূল্যবোধ গড়ে ওঠে কীভাবে? মানুষ কি নিজেই সিদ্ধান্ত নেয় কোনটি ভালো কিংবা মন্দ, নাকি পরিবার, শিক্ষা, সমাজ ও প্রতিষ্ঠান তাকে সেই সিদ্ধান্ত নিতে শেখায়?

একটা শিশু যখন পরিবারে ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার চর্চা দেখে, তখন এসব আচরণ তার কাছে স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে। আবার পরিবারের বড়রা ভিন্ন রাজনৈতিক মতের মানুষকে অপমান করলে সেখান থেকেও সে শিক্ষা পেতে পারে। মনোবিজ্ঞানী অ্যালবার্ট বান্দুরা’র সামাজিক শিক্ষার ধারণা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষ শুধু সরাসরি নির্দেশনা থেকে নয়, অন্যের আচরণ পর্যবেক্ষণ এবং তার পরিণতি দেখেও শেখে। ফলে সমাজে কোন আচরণকে গ্রহণযোগ্য কিংবা প্রশংসনীয় মনে করা হচ্ছে, তা মূল্যবোধ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এভাবে দেখলে মানুষের আচরণকে শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা কঠিন। আমরা এমন একটি সমাজে জন্মগ্রহণ করি, যার ভাষা, সংস্কৃতি, নিয়ম ও প্রত্যাশা আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত। পরিবার, বিদ্যালয়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা আমাদের চিন্তা ও আচরণকে নানা উপায়ে প্রভাবিত করে।

সমাজতাত্ত্বিক এমিল দ্যুর্কাইম সামাজিক নিয়ম ও মূল্যবোধের এই প্রভাবকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তার মতে, সমাজের অনেক নিয়ম ও প্রত্যাশা ব্যক্তির বাইরে অবস্থান করেও তার আচরণের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। অর্থাৎ ব্যক্তির চিন্তা ও সিদ্ধান্ত অনেকাংশে বিদ্যমান সামাজিক বাস্তবতার মধ্যেই গড়ে ওঠে। কিন্তু সামাজিক নিয়ম যদি মানুষের আচরণকে গড়ে তোলে, তাহলে সমাজে পরিবর্তন আসে কীভাবে?


মানুষ যদি শুধু প্রচলিত নিয়মের অনুসারী হতো, তাহলে অন্যায় প্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কিংবা সামাজিক আন্দোলনের জন্ম হতো না। ইতিহাসে বহু পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে এমন মানুষের উদ্যোগে, যারা প্রতিষ্ঠিত নিয়মকে প্রশ্ন করেছেন। নারীর অধিকার, নাগরিক অধিকার কিংবা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দেখায়, মানুষ শুধু সামাজিক ব্যবস্থার দ্বারা প্রভাবিত হয় না; প্রয়োজনে সেই ব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবিও তুলতে পারে। তবে ব্যক্তির উদ্যোগ বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনে রূপ নিতে প্রায়ই সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজন হয়।

এই দ্বিমুখী সম্পর্ক বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন সমাজতাত্ত্বিক অ্যান্থনি গিডেন্স। তার গঠন তত্ত্ব (Structuration Theory) অনুযায়ী, সামাজিক কাঠামো মানুষের আচরণকে যেমন প্রভাবিত করে, তেমনি মানুষের দৈনন্দিন আচরণের মাধ্যমেই সেই কাঠামো টিকে থাকে কিংবা পরিবর্তিত হয়।

সহজভাবে বললে, প্রতিষ্ঠান মানুষকে গড়ে তোলে, আবার মানুষও নিজের আচরণ ও উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানকে গড়ে তোলে। তবে এই সম্পর্ক সবসময় সমান ক্ষমতার নয়। রাষ্ট্র আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করতে পারে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আচরণের নিয়ম নির্ধারণ করতে পারে, আর নাগরিকরা তাদের অংশগ্রহণ ও সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে এসব নিয়ম পরিবর্তনের দাবি তুলতে পারেন।

ট্রেনের প্ল্যাটফর্মের ঘটনাটির দিকে আবার তাকালে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। সেখানে পর্যাপ্ত ময়লা ফেলার ব্যবস্থা কিংবা কার্যকর জরিমানার বিধান থাকলে দায়িত্বশীল আচরণের পরিবেশ তৈরি হতে পারত। কিন্তু মানুষ যদি মনে করে জনপরিসর রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারের, তাহলে নিয়মের কার্যকারিতা অনেকাংশে নজরদারির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে।

আবার নাগরিকরা পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব উপলব্ধি করলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না থাকলে তাদের পক্ষে দায়িত্বশীল আচরণ করা কঠিন হতে পারে। ফলে ব্যক্তির সদিচ্ছা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা একে অন্যের বিকল্প নয়।

এই সম্পর্ক সামাজিক সহনশীলতার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। একটি বিশ্ববিদ্যালয় ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা ও বৈষম্যবিরোধী নীতি গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রশাসনের দৈনন্দিন আচরণে তার প্রতিফলন না ঘটলে নীতিটি কাগুজে ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।

আবার প্রতিষ্ঠান যদি ভিন্নমত প্রকাশের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত না করে, তাহলে ব্যক্তিগত সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সহনশীলতার চর্চা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। একইভাবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আইনগতভাবে স্বীকৃত হলেও সামাজিক অপমান, হুমকি কিংবা সহিংসতার আশঙ্কা সেই স্বাধীনতার বাস্তব চর্চাকে সীমিত করতে পারে।

এখানেই সমকালীন সামাজিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নিহিত রয়েছে। নিজের মত প্রকাশের অধিকার দাবি করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অন্যের ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার স্বীকার করাও প্রয়োজন। নিজের পরিচয়ের স্বীকৃতি চাওয়ার পাশাপাশি অন্যের ভিন্ন পরিচয়ের মর্যাদা রক্ষা করাও জরুরি। কিন্তু এসব মূল্যবোধ শুধু আইন দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা কঠিন, যদি মানুষের দৈনন্দিন সম্পর্ক ও সামাজিক আচরণে তার প্রতিফলন না ঘটে।

সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট ডেভিড পুটনাম তার বোলিং অ্যালোন (২০০০) গ্রন্থে সামাজিক পুঁজি-এর গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেছেন। মানুষের পারস্পরিক আস্থা, সামাজিক সম্পর্ক এবং সহযোগিতার নেটওয়ার্ক সম্মিলিতভাবে কাজ করার সক্ষমতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ভিন্ন সামাজিক পরিচয়ের মানুষের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠা গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ শুধু নিজের পরিবার, গোষ্ঠী কিংবা মতাদর্শের মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া বৃহত্তর মানবিক সমাজ গঠনের জন্য যথেষ্ট নয়। একটি সমাজের মানবিকতার পরীক্ষা হয় তখনই, যখন মানুষ নিজের সঙ্গে দ্বিমত পোষণকারী ব্যক্তির অধিকার ও মর্যাদাকেও সম্মান করতে পারে।

তবে সহনশীলতার অর্থ অন্যায় মেনে নেওয়া নয়, ক্ষমাশীলতার অর্থ অপরাধের বিচার থেকে অব্যাহতি দেওয়া নয়, আর সামাজিক সম্প্রীতির অর্থ মতপার্থক্য চাপা দেওয়া নয়। বরং একটি মানবিক সমাজে মানুষ অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি দাবি করবে, কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় অন্যের মানবিক মর্যাদাকে অস্বীকার করবে না। সহমর্মিতা ও ন্যায়বিচার তাই পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়।

এই বাস্তবতায় সামাজিক পরিবর্তনের দায়িত্ব শুধু সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না, আবার ব্যক্তির নৈতিক দায়িত্বের কথা বলে রাষ্ট্রের দায়ও কমিয়ে দেওয়া যায় না। সরকারকে আইনের শাসন, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং জনসেবা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠন, গণমাধ্যম এবং নাগরিকদেরও নিজেদের ভূমিকা নিয়ে ভাবতে হবে। কারণ প্রতিষ্ঠান শুধু নিয়ম তৈরি করে না; প্রতিষ্ঠান পরিচালনাকারী মানুষের আচরণও সমাজকে প্রভাবিত করে। আবার মানুষের মূল্যবোধ ও সম্মিলিত উদ্যোগও প্রতিষ্ঠানের চরিত্র বদলে দিতে পারে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু সমাজ কত দ্রুত বদলাচ্ছে, তা নয়; সেই পরিবর্তন আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, সেটিও। একটি সমাজে নতুন আইন হতে পারে, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ঘটতে পারে, মানুষের স্বাধীনতা ও সুযোগ সম্প্রসারিত হতে পারে। কিন্তু এসব অর্জনের পাশাপাশি যদি পারস্পরিক অবিশ্বাস, বিদ্বেষ এবং অসহিষ্ণুতা থেকে যায়, তাহলে সামাজিক অগ্রগতির মূল্যায়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে ফেলে দেওয়া পানির বোতলটি হয়তো খুব সামান্য ঘটনা। কিন্তু ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সামাজিক পরিবর্তন শুধু বাইরে থেকে নিয়ম আরোপের বিষয় নয়, আবার শুধু ব্যক্তিগত সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীলও নয়।

মানুষ ও প্রতিষ্ঠান পরস্পরকে প্রভাবিত করে বলেই সমাজ বদলায়। আর সেই পরিবর্তন কতটা মানবিক হবে, তা নির্ভর করে আমরা কেমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছি এবং সেই প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ও বাইরে কেমন আচরণের চর্চা করছি তার ওপর।

ড. মো. শাহরিয়ার ইসলাম : সহকারী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, টেক্সাস এ অ্যান্ড এম ইউনিভার্সিটি-কর্পাস ক্রিস্টি, ইউএসএ; পরিচালক, প্রজেক্ট এইচ বি সি উ, ক্যালিফোর্নিয়া, ইউএসএ

বিজ্ঞাপন নমুনা বিজ্ঞাপন (বদলে দিন)